বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সাহেব বাড়ির কৃতী সন্তান, সাবেক নির্দলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস এবং মেহনতি মানুষের প্রিয় নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ তালুকদার আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যুতে আমতলী-তালতলীসহ বরগুনার দক্ষিণাঞ্চলে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
সালাউদ্দিন আহমেদ তালুকদার ছিলেন একটি ঐতিহ্যবাহী ও সংগ্রামী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা ইসমাইল হোসেন বাদশা মিয়া তালুকদার ১৯৫৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।
দক্ষিণ জনপদের মানুষের অধিকার ও কল্যাণের রাজনীতিতে তাঁর পরিবারের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। তিনি দক্ষিণাঞ্চলের বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জননেতা মরহুম নিজাম উদ্দিন আহমেদের স্নেহধন্য ছোট ভাই ছিলেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সালাউদ্দিন আহমেদ তালুকদার ছিলেন নেতৃত্বের গুণে উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদের জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে জনসেবামূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। সহজ-সরল জীবনযাপন, স্পষ্টবাদিতা, সাহসী ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে আমতলী-তালতলীর মানুষের কাছে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। বিশেষ করে মেহনতি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ এবং তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের প্রিয়জন।
তাঁর পারিবারিক ইতিহাসও দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর সহোদর চার ভাই মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অবদান রাখেন। ফলে দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণের চেতনা ছিল তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকারেরই অংশ।
সালাউদ্দিন আহমেদ তালুকদার ঢাকা-বরিশাল বিভাগ সমিতির আজীবন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজধানীতে বসবাস করলেও শেকড়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। আমতলী ও বৃহত্তর বরগুনার মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অবিচ্ছিন্ন।
তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর আমতলী, তালতলী ও বরগুনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষ তাঁর স্মৃতিচারণ করেন। অনেকেই তাঁর সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও নানা স্মৃতির কথা তুলে ধরে শোক প্রকাশ করেন।
স্বজন ও স্থানীয়দের কাছে তাঁর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারের জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাঁর সাহসী ব্যক্তিত্ব, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহজ-সরল জীবনবোধ এবং পারিবারিক রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের আদর্শ তাঁকে মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে—এমনটাই মনে করছেন তাঁর স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
সালাউদ্দিন আহমেদ তালুকদারের প্রথম জানাজা ঢাকার ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। পরে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় আমতলী উপজেলার কুকুয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
দ্বিতীয় জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁকে কুকুয়া ইউনিয়নের নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
প্রিয়জন, স্বজন ও অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন দক্ষিণ জনপদের এই পরিচিত মুখ।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ, মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা ও স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী। সালাউদ্দিন আহমেদ তালুকদারও তাঁর কর্ম, সাহসী ব্যক্তিত্ব ও মানুষের সঙ্গে গড়ে তোলা আত্মিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আমতলী-তালতলী তথা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।