“কিছুই তো করা হলো না, অথচ মানুষের জন্য কত কিছু করার ছিল”—এই ভাবনাই যেন তাঁর পথচলার অন্যতম প্রেরণা।
মানুষের জীবনে স্বপ্ন আসে নানা রঙে। কেউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, কেউ পরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্ন দেখেন। আবার কেউ কেউ নিজের স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে অন্য মানুষের জীবন, সমাজ ও দেশকে নিয়ে ভাবেন। আলমগীর কবির তেমনই একজন মানুষ—যাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তরুণদের সংগঠিত করা, পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়ার নানা প্রয়াসে।
১৯৭৭ সালের ১০ মে নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের ভাতগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলমগীর কবির। পিতা মরহুম মজিবুর রহমান এবং মাতা জাহানারা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ছোটবেলা থেকেই মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। এর পেছনে পারিবারিক পরিবেশের বড় ভূমিকা ছিল। তাঁর বাবা মজিবুর রহমান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে টানা ১৭ বছর মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই জীবনযাপন আলমগীর কবিরের শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। সম্ভবত সেখান থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষাটি ধীরে ধীরে তাঁর ভেতরে জায়গা করে নেয়।
ছাত্রজীবন থেকে স্বপ্ন, সংগঠক হয়ে ওঠার
আলমগীর কবিরের শিক্ষাজীবন শুরু আগ্রাদ্বিগুণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাঝে কিছু সময় নওগাঁ ও নজিপুরে পড়েছেন। এরপর ৭ম শ্রেণী থেকেই আগ্রাদ্বিগুণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। স্কুল ও কলেজ জীবন থেকেই খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউট ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তাঁর চিন্তার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। সমাজের বৈষম্য, শ্রমজীবী ও কৃষকের জীবন, মানুষের অধিকার এবং দেশের বিভিন্ন সংকট তাঁকে ভাবতে শুরু করায়। সেই ভাবনাথেকেই প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। পরে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারন সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র অবস্থাতেই সিপিবির রাজনীতির সাথে যুক্ত হোন।
একসময় কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার জন্য পূর্ণকালীন সংগঠক হিসেবে গ্রামেগঞ্জে থেকেছেন। কৃষকের দ্বারে দ্বারে গেছেন, তাদের কথা শুনেছেন, হাটসভা করেছেন। শহরের সভা-সমাবেশের বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা তাঁর সংগঠক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যখন মানুষের বিপদই হয়ে ওঠে নিজের দায়
আলমগীর কবিরের জীবনকাহিনির একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় খুলনার খালিশপুরের শ্রমিকদের দুর্দিন। এক-এগারোর জরুরি শাসনের সময় খুলনার খালিশপুর এলাকার পাটকলগুলোর শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বেতন-সংকট ও খাদ্যকষ্টের খবর তাঁর কাছে পৌঁছায়। হাজার হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার তখন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। অনেক পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। খবরটি জানার পর তিনি সহযোগীদের নিয়ে উদ্যোগ নেন। দেশের কয়েকজন পরিচিত মানুষের সহযোগিতায় শ্রমিকদের জন্য লঙ্গরখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া নয়—শ্রমিকদের দুর্দশাকে জনসমক্ষে তুলে ধরা। বিষয়টি গণমাধ্যমের নজরেও আসে। তৈরি হয় জন আলোচনা। একই সঙ্গে আসে চাপ ও নানা ঝুঁকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী কাজের পথকে আরও দৃঢ় করে। এরপর যখনই দেশের কোথাও বড় দুর্যোগ এসেছে—সিডর, আইলা কিংবা নার্গিস—তখনই তিনি নিজের পরিচিত মানুষ ও সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
আন্দোলন থেকে পরিবেশের পথে
কৃষক-শ্রমিকের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা তাঁকে ধীরে ধীরে পরিবেশ ও জনজীবনের বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।
ফুলবাড়ীর কয়লাখনি, কানসাটের বিদ্যুতের দাবি কিংবা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে জনআন্দোলন—দেশের বিভিন্ন নাগরিক ও পরিবেশগত ইস্যুতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। পরিবেশ, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তরুণদের পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি।
সেই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে গ্রীন ভয়েস। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই পরিবেশবাদী সংগঠন পরবর্তীতে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার নানা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়। তরুণদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি এবং তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাই হয়ে ওঠে সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
সংগঠনই তাঁর কাজের প্রধান শক্তি
আলমগীর কবিরের জীবনকে একক কোনো সংগঠনের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। দীর্ঘ সাংগঠনিক জীবনে তিনি জাতীয় ত্রাণ কমিটি, ঘুড়ি ফেডারেশন, তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ আন্দোলন, ভোক্তা অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ, খেলাঘরসহ নানা সামাজিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাজের ধরনেও একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি একা কিছু করার চেয়ে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতেই বেশি আগ্রহী। তাঁর কাছে সংগঠন মানে শুধু একটি কমিটি নয়; সংগঠন মানে মানুষকে একটি ভালো কাজের জন্য একত্র করা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে সমাজের জন্য কিছু করার সুযোগ তৈরি করা।
পেশাজীবন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আলমগীর কবির নিজের পেশাগত জীবনও গড়ে তুলেছেন। তিনি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ইভ্যালুয়েশনস অ্যান্ড কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেড (ECONS)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডকে তিনি নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে রেখেছেন। নিজের এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার উদ্যোগও দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছেন। তাঁর ভাবনায় ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব মানুষের কাজে লাগানো—এটিকেই তিনি জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।
বাবার স্মৃতি থেকে মানুষের জন্য নতুন উদ্যোগ
আলমগীর কবিরের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর বাবা মরহুম মজিবুর রহমানকে ঘিরে। মজিবুর রহমান ছিলেন আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তাঁর জনসম্পৃক্ত জীবন ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ছেলের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার ও মজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা, পাঠাভ্যাস, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, সাংস্কৃতিক আয়োজন, খেলাধুলার প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
একটি গ্রন্থাগার, একটি স্বপ্ন
মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার আলমগীর কবিরের চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। তিনি মনে করেন, একটি সমাজের পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে হয় না; মানুষের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করাও জরুরি। আর সেই কাজের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম বই। সেই ভাবনা থেকেই গ্রন্থাগারকে শুধু বই রাখার জায়গা হিসেবে নয়, মানুষের জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস তৈরি, পাঠচক্র, গল্প বলা, গ্রামে গ্রামে বই পৌঁছে দেওয়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে গ্রন্থাগারটি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। আলমগীর কবিরের কাছে একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া কেবল একটি বই দেওয়া নয়; এটি তার সামনে একটি নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দেওয়ার মতো।
তরুণদের নিয়ে তাঁর স্বপ্ন
আলমগীর কবিরের ভাবনার কেন্দ্রে তরুণ সমাজের একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, শিক্ষা, দক্ষতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ওপর। তাই তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা, সংগঠক, সংস্কৃতিমনা ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও খেলাধুলার গুরুত্বও তাঁর কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর নিজের শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছে—শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা একজন মানুষকে সম্পূর্ণ করে না; মাঠ, সংস্কৃতি, বই, সংগঠন এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কও একজন মানুষকে গড়ে তোলে।
সাফল্য-সংগ্রামে পাশে থাকা মানুষটি
ছাত্রজীবনেই লায়লা আরজুর সঙ্গে আলমগীর কবিরের বিবাহ হয়। দীর্ঘ পথচলায় স্ত্রী লায়লা আরজু তাঁর জীবন ও কাজের সঙ্গী এবং অনুপ্রেরণার অংশ হয়ে আছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা সহজ নয়। পরিবার, পেশা ও সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখার পেছনে পরিবারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। আলমগীর কবিরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
যে স্বপ্ন এখনও শেষ হয়নি
আলমগীর কবিরের বয়স এখন জীবনের এমন এক পর্যায়ে, যখন একজন মানুষ পেছনে ফিরে নিজের অর্জনের হিসাব করতে পারেন। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায়, মনে হয়—
“কিছুই তো করা হলো না, অথচ কত কিছু করার ছিল।”
এই উপলব্ধিই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।