নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জমির ভুয়া নামজারি (খারিজ) কপি ও ডিসিআর রশিদ তৈরির মতো গুরুতর অপরাধে ওয়াদুদ মিয়া ওরফে বাবু (২৬) নামের এক যুবককে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে জালিয়াতির সরাসরি প্রমাণ থাকার পরও মূল অপরাধ আড়াল করে ‘সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার’ হালকা ধারায় সাজা দেওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদেরের ভূমিকা নিয়ে চরম বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত ওয়াদুদ মিয়া মোহনগঞ্জ পৌরশহরের সাতুর এলাকার মৃত শাহজাহানের ছেলে। তিনি উপজেলা পরিষদ চত্বরে একটি কম্পিউটার দোকানের মাধ্যমে অনলাইনে বিভিন্ন সেবা দিতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাগডরা এলাকার বাসিন্দা মাহবুব মিয়া তার ৫ শতাংশ জমি নামজারির জন্য ওয়াদুদকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা দেন। চুক্তি অনুযায়ী ওয়াদুদ তাঁকে একটি প্রস্তুতকৃত নামজারি কপি ও ডিসিআর রশিদ বুঝিয়ে দেন। গত ৩১ আগস্ট (সোমবার) দুপুরে মাহবুব ওই কাগজপত্র নিয়ে বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ভূমিকর দিতে যান। সেখানে কাগজপত্র যাচাইয়ের পর কর্মকর্তা বুঝতে পারেন এগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল।
পরবর্তীতে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা কৌশলে মাহবুবের মাধ্যমে ওয়াদুদকে ডেকে আনেন। সোমবার সন্ধ্যায় পৌরশহরের বসুন্ধরা এলাকা থেকে পুলিশ তাঁকে আটক করে।
আটকের পর সোমবার রাতেই সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদের পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারায় ওয়াদুদকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়—‘ভুয়া ডিসিআর ও খারিজ কপি দাখিলের মাধ্যমে সরকারি কার্য সম্পাদনে বাধা’ দেওয়ায় এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জাল দলিল প্রস্তুত করা এবং সরকারি ফি আত্মসাৎ করা একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ, যার জন্য নিয়মিত (রেগুলার) মামলায় দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু ভুয়া কাগজপত্র বানানোর অপরাধে মাত্র ১০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়ায় অপরাধীকে একপ্রকার পার পাইয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মান্নু রায়হান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আমি নিজে বাদী হয়ে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করলে জালিয়াতের আরও কঠোর সাজা নিশ্চিত করা যেত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদের নিজের সিদ্ধান্তকে মেলানোর চেষ্টা করে বলেন, “ভুয়া নথি তৈরি করে আমার দাপ্তরিক কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। মোবাইল কোর্টে সরাসরি জালিয়াতির বিচার করার আইনি সুযোগ নেই। তাই তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতেই সরকারি কাজে বাধার ধারা প্রয়োগ করেছি। নিয়মিত মামলা দিলে পুরো বিষয়টি আমার এক্তিয়ারের বাইরে চলে যেত।”
তবে এসিল্যান্ডের এই ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান স্পষ্ট জানান, “জাল কাগজ তৈরির ঘটনার সঙ্গে ১৮৬ ধারায় ‘সরকারি কাজে বাধা’ দেওয়ার বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনায় এই ধারা প্রয়োগ করার সুযোগ নেই।”
জাল নথি তৈরির মতো মারাত্মক অপরাধে কঠোর বিচার না হয়ে হালকা ধারায় নামকাওয়াস্তে সাজা দেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে কোনো বিশেষ কারসাজি রয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।