সরকারি চাকুরিজীবী সহায়ক ক্লাব প্রতিষ্ঠায় বিতর্ক নয়,ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান সচেতন মহলের।
একটি জেলার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সরকারি চাকুরিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনভর দাপ্তরিক দায়িত্ব, জনসেবা,উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নানা প্রশাসনিক ব্যস্ততার মধ্যেও কর্মকর্তাদের মানসিক প্রশান্তি,পারস্পরিক সৌহার্দ্য,শারীরিক সুস্থতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় মাগুরায় পুনর্গঠিত রূপে যাত্রা শুরু করেছে ‘অফিসার্স ক্লাব’। জেলার কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ,বিনোদন,খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি সম্মিলিত পরিসর হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।শনিবার (৭ নভেম্বর) মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে অফিসার্স ক্লাব,মাগুরার শুভ উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন,পিপিএম-সেবা,মাগুরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক,মাগুরা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক মিরাজ আহমেদ,মোহাম্মদপুর প্রেসক্লাবের মাসুদ রানা এবং জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ছয় দশকের ঐতিহ্য থেকে অফিসার্স ক্লাব।
অফিসার্স ক্লাব,মাগুরার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী,বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথম দিকে মহকুমা প্রশাসন ও মুন্সেফ আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যোগে ‘মাগুরা স্টেশন ক্লাব’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মো.আসাফুদ্দৌলা পূর্বতন গিরিন পার্কের একাংশে ভবন নির্মাণ করে ক্লাবটি স্থানান্তর করেন এবং নামকরণ করেন ‘দিনান্ত ক্লাব’।মাগুরা মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ৫৯৮২, ৫৯৮৩ ও ৫৯৮৪ দাগের ৫২ শতক সরকারি জমিতে ক্লাবটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানে লন টেনিসসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহঃ নুরুজ্জামান খান নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আলম নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন করেন। পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসক ড.আশরাফুল আলম ২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর ভবনের সংস্কার ও পুনরায় চালুকরণ কার্যক্রম এবং ২০২১ সালের ২৩ মে লন টেনিস প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড ও ব্যাডমিন্টন কোর্টের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এবার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদের উদ্যোগে ‘অফিসার্স ক্লাব, মাগুরা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক নতুন যাত্রা শুরু হলো।
সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য আলাদা ক্লাব কেন প্রয়োজন?
একটি জেলার সরকারি কর্মকর্তারা বিভিন্ন দপ্তরে পৃথক দায়িত্ব পালন করলেও তাদের সম্মিলিত লক্ষ্য জনসেবা ও জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন। কিন্তু দাপ্তরিক কাজের বাইরে পারস্পরিক পরিচিতি,মতবিনিময়, খেলাধুলা,সাংস্কৃতিক চর্চা এবং অনুকূল পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ সব সময় তৈরি হয় না।এ ক্ষেত্রে অফিসার্স ক্লাব একটি কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি,অভিজ্ঞতা বিনিময়,খেলাধুলা ও শরীরচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মজীবনের একঘেয়েমি দূর করার সুযোগ তৈরি হবে।বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক সুস্থতা তাদের পেশাগত কর্মদক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।কর্মক্ষেত্রের বাইরে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হলে আন্তদপ্তর সমন্বয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ অফিসার্স ক্লাব কেবল বিনোদনের জায়গা নয়,বরং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য,পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদারের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
টাউন হল ক্লাব ও অফিসার্স ক্লাব: উদ্দেশ্য আলাদা,প্রয়োজনও আলাদা।
মাগুরার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে টাউন হল ক্লাবের রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। প্রায় ১০৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই পাবলিক ক্লাব মাগুরার সাধারণ মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত।সম্প্রতি টাউন হল ক্লাবের নিজস্ব জমিতে নির্মিত মধুমতি সিনেমা হল ও মার্কেটের বকেয়া ভাড়া বাবদ আনুমানিক ৩৬ লাখ টাকা টাউন হল ক্লাবের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছেন ক্লাবের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ক্লাবটির কার্যক্রম সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রেখে খেলাধুলা,বিনোদন ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে।অন্যদিকে অফিসার্স ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক সময়ের বাইরে নিজস্ব পরিসরে বিনোদন, খেলাধুলা,সাংস্কৃতিক চর্চা ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা।দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। টাউন হল ক্লাব সাধারণ মানুষের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক পরিসর। আর অফিসার্স ক্লাব সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত পরিচয় ও পারস্পরিক সম্প্রীতিকেন্দ্রিক একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান।
তাই একটির অস্তিত্ব অন্যটির জন্য প্রতিবন্ধক হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বরং একটি জেলার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর সমৃদ্ধ করতে এ ধরনের পৃথক উদ্যোগ পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে।
সাংবাদিকদের জন্য প্রেসক্লাব,সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন সংগঠন,কর্মকর্তাদের জন্য অফিসার্স ক্লাব।
মাগুরা জেলায় সাংবাদিকদের পেশাগত কার্যক্রম ও পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য রয়েছে মাগুরা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন। সাধারণ মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক,ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যও রয়েছে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।একইভাবে সরকারি দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিজস্ব পেশাগত ও সামাজিক পরিসর হিসেবে একটি অফিসার্স ক্লাব থাকা অস্বাভাবিক কিংবা অযৌক্তিক কোনো বিষয় নয়।প্রশ্ন হচ্ছে,একটি জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য পৃথক সংগঠন ও ক্লাব থাকতে পারলে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি নিজস্ব মিলনমেলা থাকলে আপত্তির কারণ কী? সরকারি কর্মকর্তারাও সমাজেরই অংশ। তাদের ব্যক্তিগত জীবন,পরিবার,বিনোদন,শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন রয়েছে। দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের বাইরে তাঁদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা কোনো বিলাসিতা নয়; বরং একটি সুস্থ কর্মপরিবেশের অংশ।
অপপ্রচার নয়,ইতিবাচক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান।
অফিসার্স ক্লাবের আনুষ্ঠানিক যাত্রাকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো মহলে বিভ্রান্তিকর আলোচনা ও সমালোচনার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে সচেতন মহলের মতে,কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না জেনে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো সমীচীন নয়।কোনো উদ্যোগের স্বচ্ছতা,সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার কিংবা পরিচালনাব্যবস্থা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন থাকলে তা অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে উত্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি সামাজিক ও বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মৌলিক প্রয়োজনীয়তাকে অযৌক্তিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা ইতিবাচক প্রশাসনিক উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।সচেতন মহলের প্রত্যাশা,অফিসার্স ক্লাবটি যেন কেবল উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। নিয়মিত খেলাধুলা,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,শরীরচর্চা,পারিবারিক মিলনমেলা ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এটি একটি প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।একই সঙ্গে সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার,আর্থিক স্বচ্ছতা,ক্লাবের সুনির্দিষ্ট পরিচালনাবিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রশাসনিক সম্প্রীতি ও জনসেবার ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা।
মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদের উদ্যোগে অফিসার্স ক্লাবের নতুন যাত্রা জেলার প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিসরে একটি ইতিবাচক সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পূর্ববর্তী জেলা প্রশাসকদের ধারাবাহিক অবদান ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়ন এবং কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে এটি ভবিষ্যতে জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্রে পরিণত হবে।একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন,সরকারি কর্মকর্তাদের সুস্থ বিনোদন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হওয়া মানেই জনসেবার পরিধি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং দায়িত্বশীল,সুস্থ ও কর্মোদ্দীপনাসম্পন্ন কর্মকর্তা তৈরিতে এ ধরনের সামাজিক পরিসর সহায়ক হতে পারে।মাগুরার মানুষের প্রত্যাশা,টাউন হল ক্লাব তার শতবর্ষী ঐতিহ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে,সাংবাদিক সংগঠনগুলো তাদের পেশাগত কার্যক্রম চালিয়ে যাবে এবং অফিসার্স ক্লাব সরকারি কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সুস্থ বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হবে।একটি জেলার উন্নয়নে প্রশাসন,সাংবাদিকতা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা যেমন প্রয়োজন,তেমনি প্রয়োজন প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের নিজস্ব সাংগঠনিক ও সামাজিক পরিসর। সেই বিবেচনায় মাগুরায় অফিসার্স ক্লাবের যাত্রাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়,বরং একটি সুস্থ ও সমন্বিত সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখার প্রত্যাশা সচেতন মহলের।