মো. রাকিবুল্যাহ সোহাগ, সাতক্ষীরা(শ্যামনগর) প্রতিনিধি:
সুন্দরবনের দুর্গম নদীপথ যেন সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিদের কাছে হয়ে উঠেছে অবৈধ পণ্য পাচারের অন্যতম মাধ্যম। স্থলপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে সীমান্তবর্তী নদী ও সুন্দরবনের বিভিন্ন দুর্গম নৌপথ ব্যবহার করে ভারত থেকে মাদকসহ নানা ধরনের অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পথে মাদক, অস্ত্র, চোরাই মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, নিষিদ্ধ ওষুধ, যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট, প্রসাধনী, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য আনা হচ্ছে। পরে স্থানীয় এজেন্ট ও বাহকদের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে প্রায়ই অবৈধ পণ্যের চালান ও বাহক আটক হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাহক কিংবা ছোট পর্যায়ের পাচারকারীরা ধরা পড়লেও এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের অনেকেই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
দুর্গম নদীপথই ভরসা
তথ্যানুসন্ধানে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সীমান্তবর্তী কৈখালী, রমজাননগর ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চোরাকারবারি চক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। সুন্দরবনের দুর্গম চরাঞ্চল, নদী ও খালকে কাজে লাগিয়ে রাতের আঁধারে অবৈধ পণ্য পরিবহনের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীপথে আনা এসব পণ্য বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিতে নিম্নআয়ের মানুষদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অল্প সময়ে তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিকের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের এ কাজে যুক্ত করা হয়। ফলে কোনো চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে মূল চক্রের পরিবর্তে বাহকরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
র্যাবের অভিযানে প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল জব্দ
সম্প্রতি র্যাব-৬-এর একটি দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২১ আগস্ট রাতে সুন্দরবনসংলগ্ন পার্শ্বেখালী গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের মাদক, প্রসাধনী সামগ্রীসহ বিভিন্ন অবৈধ মালামাল জব্দ করা হয়।
এ সময় নূরুজ্জামান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হলেও মূল হোতা পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জব্দ করা মালামালের একটি অংশ সুন্দরবনের নদীপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল।
কোস্টগার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ
মোংলা কোস্টগার্ডের মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন অভিযানে চারটি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১১ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ১ হাজার ৯৫০ রাউন্ড এয়ারগানের গুলিসহ সুন্দরবনে সক্রিয় তিন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা ৫৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ৪১ বোতল বিদেশি মদ, ৬১ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ৪১ বোতল ভারতীয় বিয়ার, ২৮ হাজার টাকা মূল্যের ২৪ বোতল বিদেশি বিয়ার, ১৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা মূল্যের ১ হাজার ৭৩৩ বোতল ফেনসিডিল এবং ২ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ৫৬৩ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।
প্রায় ৩২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস
গত ২৮ জুলাই নীলডুমুর ১৭ বিজিবি বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা প্রায় ৩২ কোটি টাকা মূল্যের অবৈধ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, সীমান্তবর্তী নদীপথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র ভারত থেকে এসব মাদক ও অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
‘রাতের আঁধারে পাচার হচ্ছে’
কৈখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিম বলেন, “ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ভারত থেকে মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচার করে স্থানীয় বাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, সীমান্তবর্তী নদীপথ ও সুন্দরবনের দুর্গম চরাঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক অভিযানে বাহক ও ছোট পর্যায়ের পাচারকারীরা আটক হলেও নেপথ্যে থাকা মূল কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চোরাকারবারিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
তাদের দাবি, সুন্দরবনের নদীপথে মাদক ও অবৈধ পণ্যের পাচার বন্ধে সীমান্তবর্তী নদী-খাল ও সুন্দরবনের প্রবেশপথে নিয়মিত টহল আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন নৌযানে তল্লাশি বাড়ানো এবং আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাচারচক্রের অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।